আজ : রোববার, ২৪ জুন ২০১৮,, ১০ই শাওয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

মরণঘ্যাতি ‘ব্লু হোয়েল’ ফাঁদ থেকে আপনার সন্তানকে বাঁচাবেন যেভাবে

প্রতিবেদক:

প্রকাশ: ২০১৭-১০-০৮ ০৬:৫৫:৪৭ || আপডেট: ২০১৭-১০-০৮ ০৬:৫৯:১৮

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর এবার বাংলাদেশে হানা দিলো মরণঘাতি ব্লু হোয়েল গেম। এর আগে সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর এই গেমের বলি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মেধাবী তরুণ-তরুণী।

 

 

রাশিয়ার এক তরুণ মরণঘাতি এই গেমসটি তৈরি করেন। ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ইন্টারনেটে ‘মরণ নেশার’ এ গেম খেলে সারা বিশ্বে ১৩০ জন মারা গেছেন বলে জানিয়েছে রাশিয়ার পুলিশ।

 

 

সাম্প্রতিক সময়ে এই গেমসটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে দক্ষিণ এশিয়ার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। এমনকি গত দু’মাস ধরে ভারতজুড়ে চলছে ব্লু হোয়েল আতঙ্ক। কিন্তু অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা নামের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এই প্রথম এমন ঘটনা শোনা গেলো। এর পর থেকেই অভিভাবকদের মধ্যে এক আতঙ্ক বিরাজ করছে।

 

 

জানা যায়, শনিবার ঢাকার নিউ মার্কেট থানা এলাকার অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা নামের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী এই গেম খেলেই আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয় তার পড়ার কক্ষ থেকে। আত্মহত্যার আগে ‘ব্লু হোয়েল’র কিউরেটরের নির্দেশ মতো লিখে যাওয়া একটি চিরকুট পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

 

 

আত্মাহুতি দেওয়া ঐ কিশোরীর নাম অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা। ছিল তুখোড় মেধাবী। স্কুলের ফার্স্ট গার্ল হিসেবেই পরিচিত ছিল সে। ওয়াইডব্লিউসিএ হাইয়ার সেকেন্ডারি গালর্স স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্মিলিত মেধা তালিকায় ছিল প্রথম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় ফার্মগেটের হলিক্রস স্কুলে। তার বয়স ছিল মাত্র তেরো। পড়ছিল অষ্টম শ্রেণিতে। হলিক্রস স্কুলে ভর্তির পর থেকে বদলে যেতে থাকে সে। পড়াশোনার জন্য সে ব্যবহার শুরু করে ইন্টারনেট। কয়েক বছর আগে থেকেই এনড্রয়েড মোবাইল ফোনও ব্যবহার শুরু করে স্বর্ণা। ফেসবুকসহ স্যোশাল মিডিয়া ব্যবহার চলছিল। এরই মধ্যে সবার অজান্তে সে ঢুকে পড়ে ইন্টারনেটের এক নিষিদ্ধ গেমসে। নিহত কিশোরীর পিতার সন্দেহ, তার আদরের মেয়ে ঢুকে পড়েছিল ইন্টারনেটভিত্তিক ডেথ গেমস ব্লু হোয়েলে। গত বুধবার দিবাগত শেষ রাতে সে নিজের পড়ার কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে। পরদিন বৃহস্পতিবার ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় নিউ মার্কেট থানাধীন সেন্ট্রাল রোডের ৪৪ নম্বর বাসা ৫বি ফ্ল্যাট থেকে। ব্লু হোয়েলের কিউরেটরের নির্দেশ মতো লিখে যাওয়া একটি চিরকূটও উদ্ধার করা হয়। তা এখন পুলিশের হাতে।

 

 

তাতে বড় করে লেখা, ‘আমার আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়।’ লেখা শেষে গেমসের নির্দেশনা মতো একটি হাসির চিহ্ন আঁকা।

 

 

সুব্রত জানান, ওই চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আমার আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়।’ এমনকি গেমসের নির্দেশনা মতো একটি হাসির চিহ্নও আঁকা ছিল।

 

 

এদিকে এই গেম একজন কীভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন সে বিষয়টি জানাতে গিয়ে মারণ ফাঁদ থেকে বেঁচে যাওয়া ভারতের আলেকজান্ডার নামের এক তরুণ বলেন, এটা কোনও অ্যাপ নয়। নয় কোনও গেমও। এটা জাস্ট একটা লিঙ্ক। আর সেটা চালান এক জন অ্যাডমিন। ওই গেম খেলতে যিনিই ঢোকেন, তাকে কয়েকটি টাস্ক দেন অ্যাডমিন। প্রত্যেক দিন সেই টাস্কগুলো শেষ করতে হয়। ওই গেম খেলতে ঢোকার পর কয়েকটা দিন কাটে মোটামুটি স্বাভাবিক ভাবেই। তখন অ্যাডমিন সকলের ব্যক্তিগত পরিচিতি ও ফটোগ্রাফ সংগ্রহ করতে শুরু করেন। তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন অ্যাডমিন।

 

 

তিনি আরও জানান, এরপর থেকে অ্যাডমিন বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে শুরু করেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী খেলোয়াড়কে কবরস্থানে ঘুরে আসা থেকে শুরু করে নিজের হাত কাঁটতে হয়। ভয়ংকর সিনেমা দেখা, নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করতে করতে এক পর্যায়ে গিয়ে তাকে আত্মহত্যা করতে হয়।

 

 

এই গেমসের প্রভাবে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটায় গেমটি বন্ধ করতে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত সরকার। গুগল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, মাইক্রোসফট এবং ইয়াহুর মতো জনপ্রিয় সোশাল সাইটগুলি থেকে ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমটির লিঙ্ক মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে ভারতের তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

 

 

গেমটির এক নির্মাতাকে আটক করেছিল রাশিয়ার পুলিশ। এ ধরনের মরণ গেম তৈরির কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে ফিলিপ বোডিকিন নামের মনোবিজ্ঞানের ওই শিক্ষার্থী বলেন, যারা মারা যেতে চায় তাদের আত্মহত্যার পথকে সহজ করে দিতেই তৈরি করা হয়েছে এ গেম।

 

 

গেমটির বিভিন্ন স্টেজ দেখতে গিয়ে দেখা যায়, ৪৯তম পর্বে গেইমারকে নির্দেশনা দেওয়া হয় সকাল চারটা ২০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠতে, হরর ভিডিও দেখতে, অ্যাডমিনের পাঠানো গান শুনতে ও প্রতিদিন নিজের শরীরে একটা ক্ষত করতে। ৫০তম পর্বের নির্দেশনায় বলা হয়, উঁচু ভবনের ছাঁদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে।

 

 

অভিভাবকদের বাড়তি নজরদারির পাশাপাশি ইন্টারনেট গেইটওয়ে থেকে গেমটির লিঙ্ক মুছে ফেলার মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের এ মৃত্যু ফাঁদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

 

 

দেশের কিশোর-কিশোরীদের রক্ষা করতে বাংলাদেশ সরকারকেও ভারত সরকারের মতো পদক্ষেপই নিতে হবে বলে মনে করেন তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রেজা সেলিম। তিনি বলেন, সরকারকে প্রথমে এই গেমসের ওয়েব লিঙ্কটি বন্ধ করে দিতে হবে। অভিভাবকদের সচেতনতায় সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে অভিভাবকদের উচিত হবে তার সন্তান প্রযুক্তি কিভাবে ব্যবহার করছে সেদিকে লক্ষ্য রাখা। সে যাতে কোনোভাবেই এ ধরনের খারাপ কিছুতে যুক্ত হতে না পারে সেজন্য প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। গেমটি ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগ নিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

 

 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, এই গেমটি যারা তৈরি করেছেন তারা নিজেরই মানসিকভাবে অসুস্থ। তারা বেঁছে বেঁছে মানসিকভাবে অসুস্থ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করার মাধ্যমেই নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করেন।

 

 

তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি হিপনোটাইস হতে না চায় তবে তাকে হিপনোটাইস করা যায় না। সুতরাং যে এই গেম দ্বারা প্রভাবিত হতে চায় বা যার জীবনের প্রতি ভালোবাসা কম সেই এ গেমের মাধ্যমে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হবে।

 

 

এ গেমের মাধ্যমে সন্তানকে মৃত্যুর পথ থেকে রক্ষা করতে হলে অভিভাবকদের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সকল গেমের মধ্যেই দুটি দিক থাকে। একটি হচ্ছে অ্যাগ্রেসিভ ও অন্যটি অ্যাডিকশন। শিশুদের এসব বিজ্ঞান বর্হিভূত বিনোদনের দিকে ধাবিত হতে না দিয়ে তাদের সুস্থ ধারারা বিনোদন মাধ্যম দিতে হবে। আর কেউ যদি এই গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে তবে তার আচরণে আগে থেকেই কিছু আঁচ করা সম্ভব হবে। এক দিনেই কোনো মানুষ আত্মহত্যাকে বেঁছে নিতে পারে না। তাই শিশুর আচরণে কোনো ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করলে সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতি নজরদারি বাড়িয়ে তাকে বিপথগামী হওয়ার পথ থেকে রক্ষা করতে হবে।

 

 

ব্লু হোয়েল গেম কী?

 

অনলাইনে একটি কমিউনিটি তৈরি করে চলে এ প্রতিযোগীতা। এতে সর্বমোট ৫০টি ধাপ রয়েছে। আর ধাপগুলো খেলার জন্য ঐ কমিউনিটির অ্যাডমিন বা পরিচালক খেলতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ দিবে। আর প্রতিযোগী সে চ্যালেঞ্জ পূরণ করে তার ছবি আপলোড করবে।

 

 

শুরুতে মোটামুটি সহজ এবং কিছুটা চ্যালেঞ্জিং কাজ দেয়া হয়। যেমন: মধ্যরাতে ভূতের সিনেমা দেখা। খুব সকালে ছাদের কিনারা দিয়ে হাঁটা এবং ব্লেড দিয়ে হাতে তিমির ছবি আঁকা।

 

 

তবে ধাপ বাড়ার সাথে সাথে কঠিন ও মারাত্মক সব চ্যালেঞ্জ দেয় পরিচালক। যেগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এ খেলার সর্বশেষ ধাপ হলো আত্মহত্যা করা। অর্থাৎ গেম শেষ করতে হলে প্রতিযোগীকে অাত্মহত্যা করতে হবে।

 

 

কোথায় জন্ম:

 

এই খেলার জন্ম রাশিয়ায়। জন্মদাতা ২২ বছরের তরুণ ফিলিপ বুদেকিন। ২০১৩ সালে রাশিয়ায় প্রথম সূত্রপাত। ২০১৫ সালে প্রথম আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়।

 

 

তবে এহেন গর্হিত কাজের জন্য নিজেকে অপরাধী না বলে বরং সমাজ সংস্কারক বলে নিজেকে অভিহীত করে বুদেকিন। সে জানায়, এই চ্যালেঞ্জের যারা শিকার তারা এ সমাজে বেঁচে থাকার যোগ্য নয়।

 

 

এ গেম নিয়ে রীতিমত অবাক রাশিয়া পুলিশ। তদন্তের পর তারা জানায় অন্তত ১৬ জন কিশোরী এ গেমের কারণে আত্মহত্যা করেছে। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৩০ জনের আত্মহত্যার জন্য এ গেম দায়ী।

 

 

গেম কিভাবে তরুণ-তরুণীদের আত্মঘাতী করছে সে বিষয়ে চিন্তিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ব্রিটেন-আমেরিকায় এ গেম জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। যার ফলে সে দেশগুলো তাদের স্কুল-কলেজ সমুহে এ গেমের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে।

 

 

তবে এ গেমের মূল অ্যাডমিন বুদেকিন আটক থাকলেও থেমে নেই তাদের কার্যক্রম। যার ফলে এ গেমের প্রভাব বিরাজমান। সম্প্রতি ভারতে এ গেমের ফলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

 

 

কেনো যুবক-যুবতীরা আকৃষ্ট হচ্ছে:

 

শুরুতে তুলনামূলক সহজ এবং সাহস আছে কি না এমন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ায় তা যুবক-যুবতীদের কাছে আকৃষ্ট হয়। তবে একবার এ খেলায় ঢুকে পড়লে তা থেকে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।

 

 

খেলার মাঝপথে বাদ দিতে চাইলে প্রতিযোগীকে ব্লাকমেইল করা হয়। এমনকি তার আপনজনদের ক্ষতি করার হুমকিও দেয়া হয়। আর একবার মোবাইলে এই অ্যাপটি ব্যবহারের পর তা আর ডিলিট করা যায় না।

 

 

সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অনলাইন জরিপ

আমাদের ওয়েবসাইট আপনার কাছে কেমন লাগে?

  • ভাল (60%, ৩ Votes)
  • খূব ভাল (40%, ২ Votes)
  • ভাল না (0%, ০ Votes)
  • মন্তব্য নেই (0%, ০ Votes)

Total Voters:

Loading ... Loading ...

টিভি


ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

MonTueWedThuFriSatSun
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031 
       
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728    
       
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
  12345
13141516171819
20212223242526
27282930   
       
      1
23242526272829
3031     
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031